বিশেষ প্রতিনিধি ॥ আমাদের কুষ্টিয়া জেলায় আদমশুমারি ও গৃহগণনা ২০১১ বিবিএস,পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ১৯,৪৬,৮৩৮ জন বসবাস করেন। গত কয়েক বছরে এখানে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। স্বাস্থ্যসেবা নিতে এসে বেসরকারি ক্লিনিকে রোগীরা সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। প্রতিটি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রয়েছে নিজস্ব দালাল। সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তুলনায় বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ৮ থেকে ১০ গুণ বেশি। ডেলিভারি রোগী এনে নরমাল ডেলিভারি করতে চান না ক্লিনিকের ডাক্তাররা।
সিজার করলে রোগী প্রতি ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং অ্যাপেন্ডিসাইড হলে তো কোন কথাই নেই। হাসপাতালের মধ্যে মাত্র কয়েকটির নামে মাত্র অনুমোদন রয়েছে। লাইসেন্সের জন্য আবেদিত মাত্র ১টি। বেশির ভাগই লাইসেন্সই নেই। তথাকথিত এসব ক্লিনিকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নামে মাত্র বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা এসে রোগী দেখেন। বেশ কয়েকটি ক্লিনিক ও হাসপাতালের ডাক্তারদের সার্টিফিকেট ভুয়া এমন অভিযোগও রয়েছে। আর সেই কারণেই এসব ডাক্তারদের রোগী দেখালে প্রয়োজন ছাড়াও বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে দেন। নির্দিষ্ট হাসপাতালের ল্যাব ছাড়া অন্য কোথাও পরীক্ষা নিরীক্ষা করলেও ওইসব রিপোর্ট দেখতে চান না ডাক্তাররা।
এ ছাড়া রয়েছে ডাক্তারদের পরীক্ষা নিরীক্ষার ওপর কমিশন বাণিজ্য। বিভিন্ন হাট বাজারে গ্রাম্য ডাক্তারদের ভিজিট করার জন্য ক্লিনিকের লোকজন তাদের কাছে যান এবং তাদের পরীক্ষা নিরীক্ষার ওপর ৩০ থেকে ৫০% কমিশন দেয়া হয়। গ্রাম্য ডাক্তাররা কমিশন পাওয়ার লোভে ওইসব ক্লিনিকে পাঠান। এছাড়াও গর্ভবতী কোন রোগীদের গ্রাম্য ডাক্তাররা ক্লিনিকে পাঠালে ওইসব রোগীর নরমাল ডেলিভারি করতে চান না ক্লিনিকের ডাক্তাররা। সিজার করে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন।বিভিন্ন ভুঁইফোর ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সরেজমিনে ভুক্তভোগী রোগীদের আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে আলাপ করলে নানা তথ্য বেরিয়ে আসে।
এইসব ক্লিনিকের বেশ কয়েকটিতে প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ জন রোগী সিজার করা হয়। সিজার করতে গিয়ে অনেক সময় পরীক্ষা নিরীক্ষা না করার কারণে অনেক প্রসূতি এবং সন্তান মেরে ফেলেন। গর্ভবতী মহিলাদের সিজার করলে তাদের কমিশন বাণিজ্য অনেক গুণ বেশি হয়। সন্তান সম্ভবা মহিলাদের স্বাভাবিক ডেলিভারি করতে চান না ক্লিনিকের ডাক্তাররা। এতে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন রোগীরা। কয়েকমাস আগে কাস্টম মোড়ে একটি ক্লিনিকে অ্যাপেন্ডিসাইড অপারেশন করতে গিয়ে ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর প্রহর গুনতে হয়েছে।এদিকে কুষ্টিয়া শহরের র্যাব গলিতে অবস্থিত সেভ ডায়াগনস্টিক এন্ড মেডিক্যাল সার্ভিস নামক একটি হাসপাতালের বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলর অভিযোগ উঠেছে।
জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দুইটা রোগী সেভ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হলে তাদেরকে সকাল ৭ টা থেকে দুপুর ১ টা পর্যন্ত খালি পেটে অপারেশনের জন্য বসিয়ে রাখেন এবং সাথে না খেয়ে ছিল ভুক্তভোগী পরিবারের চার পাঁচ জন সদস্য।এদিকে দুপুর একটা পেরিয়ে গেলেও রোগীর অপারেশন হয়নি এবং সেই রোগীকে রাত দুইটার পরে অপারেশন করেন তাও আবার ক্ষুধার্ত অবস্থায়।এ বিষয়ে ভুক্তভোগীর পরিবার জীবনের সাথে কথা হলে তিনি জানান, আমার রোগী সহ অন্যান্য রোগীরা সকাল ৭ টা থেকে অপারেশনের জন্য না খেয়ে ছিল। ওটির প্রথম সিরিয়াল ছিল দুপুর ২ টায় এবং অপারেশন মিস হওয়াতে রাত ৮টায় টাইম দিয়ে দেয় ক্লিনিকের ম্যানেজার তবে আবারো মিস করেন অপারেশনের টাইম। এরপর রাত দুইটার দিকে রোগীকে অপারেশন করেন ডঃ শাফায়াত মোহাম্মদ শান্তনু।
একজন রোগীকে সারাদিন ক্ষুধার্ত অবস্থায় রেখে তাকে অপারেশন করা হলো। আমার রোগীর যদি কোন কিছু হয়ে যেত, তাহলে এর দায়ভার কে নিতো। সারাদিন রোগীর সাথে ছেলে-মেয়েসহ আমার স্ত্রী না খেয়ে রয়েছে। এই হাসপাতালের কর্তৃপক্ষদের রোগীদের প্রতি কোন ধরনের খেয়াল যত্ন নেই। আমার দাবি এদের মত লোকদের সবার সামনে এনে সাজা দেওয়া উচিত তাতে করে আর কোন হাসপাতাল মালিকপক্ষ বা ম্যানেজার এমন বেখেয়ালি ভাবে চিকিৎসার নামে হয়রানি না করতে পারে।এ বিষয়ে সেফ ডায়াগনস্টিক হাসপাতালর ম্যানেজার নয়নের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ডাক্তার ব্যস্ত ছিল তাই অপারেশনের সময় ২ বার মিস হয়েছে। তারা সারাদিন না খেয়ে ছিল এটা আমি বুঝতে পারিনি। অনাকাঙ্খিতভাবে মিসটেক হয়ে গিয়েছে।
হাসপাতালে সার্বিক খবর জানতে ম্যানেজারকে মালিকপক্ষে ডাক দিতে বললে তিনি সাংবাদিকদের বলেন,আপনার কার্ড থাকলে একটা দিয়ে যান সকালে চা খাওয়ার দাঁত রইল এই বলে তিনি এড়িয়ে যান।এ বিষয়ে সেভ ডায়াগনস্টিক হাসপাতালের মালিকপক্ষের সাথে মুঠোফোনের যোগাযোগ করলে তিনি জানান, এটা ম্যানেজারের দোষ না, এটা রোগীরও দোষ না, এটা হল ডাক্তারের দোষ। ডাক্তার কোন ইমারজেন্সি ওটিতে আটকে গেলে তখন তো আর আমাদের কিছু করার থাকে না। আর না খেয়ে থাকার বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়ায় না কারণ ডাক্তার কখন চলে আসবে এটা আমরা কিভাবে বলব। আমাদের সাথে জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের একটি ডিলিংস আছে তাদের মাধ্যমে এখানে রোগী আসে। সেভ ডায়াগনস্টিক হাসপাতালে অনুমোদনের বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি আরো জানান, অনুমোদনের সকল কাগজপত্র আছে তবে সেগুলো সাংবাদিকদের দেখাবো না। প্রশাসনকে সাথে করে নিয়ে আসুন তাহলে দেখাবো।
