বিশেষ প্রতিনিধি ॥ দেশের সকল প্রকার ফসলী বীজের উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষন, প্রক্রিয়াজাত ও বিপননের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন বিএডিসি। সরকারী ভাবে কৃষি উপকরণ সরবরাহের সিংহভাগ কার্যক্রম করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। সে কারনে কৃষি খাতের উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের বিপুল পরিমান অর্থও বরাদ্দ হয়ে থাকে বিএডিসির নানাবিধ খাতের অনুকুলে। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে সার বীজ ও সেচ সরবরাহ খাতে বিএডিসি এসব অর্থ ব্যয় করে থাকে। মোটকথা কৃষি নির্ভর অর্থনৈতিক প্রবাহকে গতিশীল করতে দেয়া কৃষি প্রনোদনার সিংহভাগ টাকা ব্যয় হয় বিএডিসির মাধ্যমে।
কিন্তু সরকারের এসব কৃষি প্রনোদনা কার্যক্রমে সিমাহীন অনিয়ম অব্যবস্থাপনার কারণে মাঠ পর্যায়ের চাষীদের কোন আস্থা নেই। বিশেষ করে নিম্নমানের মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল বীজ ব্যবহার করে বিপুল পরিমান আর্থিক ক্ষতির মুখে কোন প্রতিকার না পেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন চাষীরা। তবে চাষীদের এমন অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করছেন বিএডিসির সংশ্লিষ্ট পাটবীজ কর্তৃপক্ষ। বিএডিসি পাটবীজ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থ বছরে কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতের আওতায় পাট উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রনোদনা কর্মসূচীর অনুকুলে ১ শ ৮০ মে:টন পাটবীজ ক্রয়/সংগ্রহে কৃষি মন্ত্রনালয় বরাদ্দ দেয় ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা।
যদিও কুষ্টিয়া জোনের সংশ্লিষ্ট পাটবীজ বিভাগের দাবি তারা এবছর ২শ ৮৩ মেঃটন পাটবীজ সংগ্রহ করেছেন এবং সেগুলি প্যাকেটজাত করে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করেছেন। কিন্তু সরবরাহকৃত বীজের প্রায় সাড়ে ২৪ মেঃটন বীজ ফরিদপুর পাটবীজ বিভাগ কর্তৃক রিজেক্ট বা বাতিল ঘোষনা করে সেগুলি কুষ্টিয়া জোনের পাটবীজ গুদামে ফেরত দেয়া হয়। সেখানকার বিপনন বিভাগের উপপরিচালক সৈয়দ কামরুল হক স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে- এসব বীজের কাঙ্খিত জার্মিনেশন বা চারা না গজানোই এগুলি ফেরত দেয়া হলো। যদিও ওই চিঠিতে উল্লেখিত অভিযোগ মানতে নারাজ কুষ্টিয়া জোনের পাটবীজ বিভাগের উপ-পরিচালক মনিরা খাতুন। তিনি দাবি করেন বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ ডিল করছেন।
ওই চিঠির তথ্যসূত্র ধরে বিএডিসির পাটবীজ বিভাগের এসব বীজের মান নিয়ে সরেজমিনে অনুসন্ধানে এসব বীজ ক্রয়, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিপননে নানা অনিয়মসহ ভেজালের তথ্য উঠে আসে। চাষীরা এবছর সরকারী প্রনোদনায় পাটবীজ নিয়ে তা প্রস্তুতকৃত মাঠে রোপনের পর চারা না গজানোই যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ তার প্রকৃত চিত্র উঠে আসে কুষ্টিয়া জোনের পাটবীজ গুদামে সংরক্ষিত বীজের হাল অবস্থায়। সেখানে দেখা যায়, একই লটে স্তুপকৃত অভিন্ন তথ্য সম্বলিত প্রতি ১ কেজি প্যাকেটজাত বীজের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। খুব তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় প্যাকেট ও প্যাকেটজাত বীজের ভিন্নতা। যা দেখেই বোঝা যায় এখানে আসল নকলের মিশ্রন বিদ্যমান। বিষয়টি নিয়ে সংবাদ মাধ্যম অনুসন্ধান করছে এমন তথ্য জানতে পেরে বিপুল পরিমান বীজ গুদামের পিছনে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে।
নিয়মানুযায়ী পূর্ব হতেই তালিকাভুক্ত উদ্যোক্ত চাষীদের নানাবিধ প্রনোদনা পরামর্শ ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতার মাধ্যমে উৎপাদিত বীজ সরকারী প্রত্যয়ন এজেন্সির মাধ্যমে নমুনা পরীক্ষা করে গুনগত মান নিশ্চিত হলে সেগুলি প্রক্রিয়াজাত ও বিপনন করার কথা; যার কোন কিছুই মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার চিৎলায় অবস্থিত কুষ্টিয়া জোনের পাটবীজ গুদামে মানা হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গাংনী উপজেলার একজন উদ্যোক্তা পাটবীজ চাষী বলেন, ‘উনারা বলছেন এবছর ২ শ ৮৩ মেঃটন পাটবীজ ক্রয় করেছেন। এই বিপুল পরিমান বীজ কোথাকার কোন উদ্যোক্তা চাষীদের কাছে থেকে নিয়েছেন দেখাতে বলেন। আমার জানামতে, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনেদা মাগুড়াসহ আশপাশের ১০ জেলা কুড়িয়েও ৫০ মে:টন পাটবীজ উদ্যোক্তা চাষীরা উৎপাদন করতে পারেনি। তাহলে এতো পরিমান বীজ কোথা থেকে কোন মানদন্ডে তারা ক্রয় করেছেন ? আসলে এর সিংহভাগ বীজ পার্শ্ববর্তী ভারত থেকে হ্যাচারী ফিড হিসেবে অল্পমূল্যে আমদানি করা বীজ অসাধু ব্যবসায়ী এবং বিএডিসির উর্দ্ধতন অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজসে এই পাটবীজ গুদামে সরবরাহ করে সেগুলি প্যাকেটজাত করে বিভিন্ন ভাবে চাষীদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে’।
এবিষয়ের সত্যতা নিশ্চিত করে মেহেরপুর জেলা বীজপ্রত্যায়ন কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন জানান, ‘কুষ্টিয়া পাটবীজ জোনের আওতায় বিএডিসির তালিকাভুক্ত উদ্যোক্তা চাষীদেরসহ নিজস্ব খামারের প্রায় ৭৫ হেক্টর জমি থেকে উৎপাদিত ৫৬ মেঃ টন পাটবীজের প্রত্যায়ন ট্যাগ দেয়া হয়েছে।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল গ্রামের পাটচাষী আলাউদ্দিন মন্ডলের অভিযোগ, ‘নিন্মমানের বাতিলকৃত বীজ নতুন করে প্যাকেটে ভরি চাষীদের দেছে কৃষি অফিস। এই বীজে চারা না গজানোই আমি এক বিঘি পাটচাষের ভুঁই (জমি) প্রস্তুতে খরচ করেছি ১২ হাজার টাকা। একদিকে আমার একটা বতর (মৌসুম) জমি পাকাল পড়ে থাকলো আবার আমার গাট্যের ট্যেকাও খরচ হইলু। ইর দায় নিবি কিডা ? এই বটতৈল ইউনিয়নে যত চাষী সরকারের এই পাটের বেচন (বীজ) বোনেছে তারা কেউ দেখাতে পারবেনা যে চারা গজায়ছে।
সদর উপজেলার বটতৈল ইউনিয়নের সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল ইসলাম জানান, ‘চলতি মৌসুমে চাষীদের মধ্যে বিএডিসির পাটবীজ বিভাগের মাধ্যমে যে পাটবীজ প্রনোদনা দেয়া হয়েছে সেসব সুবিধাভোগী চাষীরা সবাই অভিযোগ করেছেন কাঙ্খিত জার্মিনেশন না পাওয়ার বিষয়ে’।
মিরপুর উপজেলার আমলা বাজারের এক বীজ ব্যবসায়ী জানায়, ‘বিএডিসি’র বীজ ভেজালের সাথে বিশাল চক্র জড়িত। কয়জনকে নিয়ন্ত্রন করবেন? এরা বাজারের ব্রান্ডিং কোম্পানীর বীজের নমুনা প্রত্যয়ন এজেন্সির মাধ্যমে পরীক্ষা করিয়ে অনুমোদন পাওয়ার পরই তাদের আমদানিকৃত নিম্নমানের বস্তাজাত বীজ প্যাকেটজাত করে প্রত্যয়ন এজেন্সির নকল ট্যাগ লাগিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক করে বিএডিসির গুদামের সরবরাহ করে। সেখান থেকে সারাদেশে এসব বীজ সাপ্লাই হচ্ছে। এটা সবাই জানে’।
সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য কারশেদ আলম বলেন, ‘শুধুমাত্র এই বছরই বিএডিসির পাটবীজ নিয়ে এতো কথা উঠেছে তা নয়। গত বছর বিএডিসির পিয়াজ বীজ নিয়ে সারা দেশের চাষীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। সরকার একক ভাবে এই বিএডিসির উপর বীজের দায়িত্ব দেয়ায় প্রতিষ্ঠানটি যাচ্ছেতাই করে যাচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। একারনে সুযোগ বুঝে একদল অসাধু বীজ ব্যবসায়ীরা বিএডিসির শীর্ষস্থানীয় অসাধু কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজস করে নিম্নমানের পচা, মেয়াদ উত্তীর্ন, বাতিলকৃত ভেজাল বীজ নামমাত্র মূল্যে ক্রয় করে সেগুলি প্যাকেটজাত করে বিপনন ও সরবরাহ করে সারাদেশের চাষীদের ক্ষতিগ্রস্ত করার মাধ্যমে কার্যত: কুষি খাতে সরকারী প্রনোদনা কর্মসূচীকে ফলাফল শুন্য করে তুলছে। এতে প্রতিবছরন কৃষি খাতে সরকারের বিনিয়োগকৃত বিপুল পরিমান টাকা গচ্ছা ও তসরূপ হচ্ছে। একই সাথে সরকারী প্রতিষ্ঠানের বীজের প্রতি চাষীদের আস্থাহীণ করে বাজারের বিভিন্ন ব্রান্ডের বীজ প্রতিষ্ঠানের বীজের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলছে। এবছর পাটবীজের ঘটনার মধ্যদিয়ে বেড়িয়ে আসা অনিয়ম দূর্নীতি তদন্ত করে এর সাথে যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে’।
চাষীদের এমন অভিযোগের বিষয়ে আলাপকালে কুষ্টিয়া জেলা বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির কর্মকর্তা একেএম কামরুজ্জামান বলেন, ‘চাষীরা যাতে গুনগত মানসম্পন্ন বীজ পায় এবং বীজ নিয়ে যাতে প্রতারিত না হয় সেজন্য বীজ প্রত্যায়ন এজেন্সি কাজ করে। সেক্ষেত্রে এজেন্সির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের সঠিক পরামর্শ দেয়া ছাড়াও আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হয়। চলতি বছরেও প্রায় ১৭টি ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে বীজ বিক্রয় ও সরবরাহ সংশ্লিষ্টদের বিধি বহির্ভুত কার্যক্রমে যুক্ত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে’।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন কর্মকর্তা কৃষিবিদ রূপালী খাতুন বলেন, ‘মূলত বিএডিসির পাটবীজ বিভাগ এই বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, বাজারজাত ও সরবরাহ করে থাকে। তারাই বলতে পারবেন কি পরিমান বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ করতে পেরেছেন। এর সবকিছুই বিএডিসি করে থাকেন। মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য আমরা শুধু চাষীদের তালিকা করে দিয়েছি মাত্র। এছাড়া এই বীজ ভালো না মন্দ সেটা আমাদের বলার বা কিছু করার সুযোগ নেই’।
বিএডিসি কুষ্টিয়ার পাটবীজ বিভাগের উপপরিচালক মনিরা খাতুন পাটবীজ বিষয়ের সকল অভিযোগকে নাকচ দিয়ে বলেন, ‘বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভাগের বড় স্যারেরা দেখছেন। আমাদের বীজের গুনগত মান নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে সেই অভিযোগ দেয়ার কোন এখতিয়ার কারো নেই’। চলতি অর্থ বছরে বিএডিসি পাটবীজ বিভাগের সংগৃহীত ২শ ৮২ মে:টন পাটবীজের গুনগত মান পরীক্ষা করেই সরবরাহ করা হয়েছে’। তবে সুবিধাভোগী, ক্রেতা বা ভোক্তা হিসেবে কারো কাছে পছন্দ না হলে তিনি ফেরত দিতেই পারেন’।
এবিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কুষ্টিয়ার উপপরিচালক ড. মো. শওকত হোসেন ভুঁইয়া বলেন,‘চাষীরা আসলে না জেনে না বুঝে পাটবীজের ভালোমন্দের দায় কৃষি অফিসের উপর দিচ্ছেন। প্রকৃত অর্থে বিএডিসির পাটবীজ বিভাগের কোন তথ্যই আমাদের কাছে থাকে না। এর ভালোমন্দের দায়ও আমাদের নয়। রাষ্ট্রীয় ভাবে সকল প্রকার বীজ ব্যবস্থাপনার কাজই করে থাকেন বিএডিসি। উনারাই এবিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারবেন’।
এবিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসান বলেন, ‘এবছর চাষীদের দেয়া পাটবীজের সমস্যা কি তা তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপপরিচালকসহ তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পেলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
