খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই জানুয়ারি ২০১৫, ২:৩ পিএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী কুষ্টিয়া জেলা। বাউল সম্রাট লালন শাহের আখড়াবাড়ি, শিলাইদহের রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি আর কুমারখালীর কালজয়ী সাহিত্যচর্চার জন্য কুষ্টিয়াকে দেশের ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ বলা হলেও, এর ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। একটি অঞ্চলের সামগ্রিক বিকাশ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা এবং চিকিৎসা খাতের অগ্রগতি নির্ভর করে তার উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর। কুষ্টিয়া জেলা তার কার্যকর সড়ক ও রেল যোগাযোগ জালের মাধ্যমে কেবল অভ্যন্তরীণ যাতায়াতকেই সহজ করেনি, বরং রাজধানী ঢাকাসহ দেশের চার প্রান্তের সাথে এক মজবুত অর্থনৈতিক সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।

কুষ্টিয়া জেলাটি দেশের জাতীয় মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়ক নেটওয়ার্কের সাথে অত্যন্ত চমৎকারভাবে যুক্ত। জেলার কেন্দ্রস্থল অর্থাৎ কুষ্টিয়া সদর থেকে আধুনিক ও চওড়া রাস্তা ধরে দেশের যেকোনো প্রান্তে এখন খুব দ্রুত ও স্বাচ্ছন্দ্যে পৌঁছানো সম্ভব। আন্তঃজেলা দূরপাল্লার বাস সার্ভিস এবং স্থানীয় পরিবহনের আধুনিকায়ন এই যাতায়াতকে করেছে আরও গতিশীল।
কুষ্টিয়া সদর জেলা শহর থেকে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরের সড়কপথের দূরত্ব পর্যালোচনা করলে এর ভৌগোলিক গুরুত্ব খুব সহজে অনুধাবন করা যায়। কুষ্টিয়া থেকে সবচেয়ে কাছে অবস্থিত প্রতিবেশী জেলা ঝিনাইদহ, যার দূরত্ব মাত্র ৪৬ কিলোমিটার। এছাড়া অন্যান্য নিকটবর্তী জেলাগুলোর মধ্যে চুয়াডাঙ্গার দূরত্ব ৪৯ কিলোমিটার, মেহেরপুর ৫৮ কিলোমিটার, রাজবাড়ী ৬৫ কিলোমিটার, পাবনা ৬৬ কিলোমিটার এবং মাগুরার দূরত্ব ৭৩ Boundaries (৭৩ কিলোমিটার)।
একটু দূরবর্তী জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, কুষ্টিয়া থেকে যশোর ৯৭ কিলোমিটার, ফরিদপুর ১৩২ কিলোমিটার, রাজশাহী ১৩৭ কিলোমিটার এবং বিভাগীয় শহর খুলনা ১৫৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। দেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের এই সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা কুষ্টিয়া থেকে রাজধানী ঢাকার দূরত্ব সড়কপথে ২৭৭ কিলোমিটার। এছাড়া অন্যান্য দূরবর্তী অঞ্চলের মধ্যে গাজীপুর ১৮৪ কিলোমিটার, বগুড়া ২২৪ কিলোমিটার, বরিশাল ২৬৪ কিলোমিটার, রংপুর ৩৩০ কিলোমিটার, কুমিল্লা ৩৭৩ কিলোমিটার, দিনাজপুর ৪০৯ কিলোমিটার এবং ময়মনসিংহ ৪৭০ কিলোমিটার। দেশের একদম শেষ প্রান্তের জেলাগুলোর মধ্যে কুষ্টিয়া থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব ৫৪১ কিলোমিটার, সিলেটের দূরত্ব ৬২৩ কিলোমিটার, কক্সবাজার ৫৭৯ কিলোমিটার এবং পাহাড়ি জেলা রাঙামাটির দূরত্ব ৬১৬ কিলোমিটার। এই সুদীর্ঘ দূরত্বের তালিকাটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, কুষ্টিয়া থেকে দেশের যেকোনো প্রান্তে যাতায়াতের জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও কার্যকর সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে।
কুষ্টিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক প্রশাসনিক পটভূমি জানা প্রয়োজন। এক সময় কুষ্টিয়া ছিল একটি বিশাল ও অবিভক্ত প্রশাসনিক অঞ্চল, যা ‘বৃহত্তর কুষ্টিয়া’ নামে পরিচিত। ১৯৮৪ সালের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের পূর্ব পর্যন্ত বর্তমান চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর জেলা কুষ্টিয়ারই দুটি মহকুমা ছিল। পরবর্তীতে এরা পূর্ণাঙ্গ ও পৃথক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও, এই তিন জেলার মানুষের ভেতরের নাড়ির টান, মুখের ভাষা, প্রমিত উচ্চারণ, লোকসংস্কৃতি এবং আঞ্চলিক আত্মপরিচয় আজও অভিন্ন রয়ে গেছে।
এই ঐতিহাসিক বন্ধন ও পারস্পরিক সখ্যকে টিকিয়ে রাখতে এবং এই অঞ্চলের মানুষের সার্বিক কল্যাণে এখনও ‘বৃহত্তর কুষ্টিয়া অ্যাসোসিয়েশন’ কিংবা ‘বৃহত্তর কুষ্টিয়া সমাজ’-এর মতো সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো দেশ-বিদেশে একযোগে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যাতায়াত ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ফলে এই তিন জেলার মানুষের যাতায়াত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক দিন দিন আরও দৃঢ় হচ্ছে।

বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও উপজেলাগুলোর দিকে তাকালে এর বিশালত্ব টের পাওয়া যায়। বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার অধীনে রয়েছে ৬টি উপজেলা, যেগুলো হলো—কুষ্টিয়া সদর, কুমারখালী, খোকসা, দৌলতপুর, ভেড়ামারা এবং মিরপুর। মেহেরপুর জেলার অধীনে রয়েছে ৩টি উপজেলা—মেহেরপুর সদর, গাংনী ও ঐতিহাসিক মুজিবনগর। আর চুয়াডাঙ্গা জেলার অধীনে রয়েছে ৪টি উপজেলা—চুয়াডাঙ্গা সদর, আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা এবং জীবননগর।
এই প্রতিটি উপজেলার ভেতরে ও পারস্পরিক সংযোগ রক্ষাকারী সড়কগুলো এখন পাকা এবং উন্নত। আন্তঃউপজেলা বাস ও স্থানীয় যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে এক উপজেলার উৎপাদিত কৃষি পণ্য, যেমন—কুষ্টিয়ার চাল ও তামাক, কুমারখালীর ঐতিহ্যবাহী তাঁতবস্ত্র, কিংবা মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গার শাকসবজি ও ফলমূল খুব সহজেই জেলা শহর ছাড়িয়ে রাজধানীসহ দেশের বড় বড় বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে। একই সাথে এই উন্নত গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগের কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা কুষ্টিয়া শহরে এসে উচ্চশিক্ষা নিতে পারছে এবং সাধারণ মানুষ দ্রুত সময়ের মধ্যে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে এসে জরুরি চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে পারছে।
দিনশেষে কুষ্টিয়া জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা কেবল ইট, পাথর আর পিচের রাস্তার কোনো জড় মাধ্যম নয়; এটি হলো এই অঞ্চলের মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক জীবন্ত অলকানন্দা। সড়ক ও রেলপথে দেশের প্রতিটি প্রান্তের সাথে এর এই কার্যকর সংযোগ কুষ্টিয়াকে জাতীয় অর্থনীতি ও প্রগতির এক অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছে।
মন্তব্য