খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ই জানুয়ারি ২০১৫, ১:৪৯ পিএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগের একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অঞ্চল হলো কুষ্টিয়া জেলা। অনেকে একে কেবল বাউল মাকড় বা এদেশের ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ হিসেবে চিনলেও, এর একটি শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র ভৌগোলিক অবস্থান রয়েছে। গড়াই আর পদ্মার পলিমাটি দিয়ে গড়া এই জেলাটির চারপাশের সীমানা, জলবায়ু এবং নদীগুলোর বিন্যাস এর অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে।
ভৌগোলিক মাপকাঠিতে কুষ্টিয়া জেলা খুব বেশি বড় না হলেও এর সুবিন্যস্ত অবয়বটি বেশ চমৎকার। এই জেলার মোট আয়তন ১,৬২১.১৫ বর্গকিলোমিটার। কুষ্টিয়ার চারপাশের সীমানার দিকে তাকালে এর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব খুব সহজে চোখে পড়ে। এই জেলার ঠিক উত্তর দিক ঘেঁষে বয়ে গেছে পদ্মা নদী, যার অপর প্রান্তে রয়েছে রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা জেলা। কুষ্টিয়ার দক্ষিণ সীমান্তে রয়েছে চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ জেলা। এর পূর্ব দিকে রয়েছে রাজবাড়ী জেলা এবং পশ্চিম সীমান্তে রয়েছে মেহেরপুর জেলা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদীয়া জেলার আন্তর্জাতিক সীমানা। এই চৌহদ্দির কারণে কুষ্টিয়া জেলাটি উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের যাতায়াত এবং বাণিজ্যের এক অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে।
কুষ্টিয়ার রূপ-লাবণ্য আর কৃষির মূল কারিগর হলো এর বুক চিরে বয়ে যাওয়া নদীগুলো। এই জেলার প্রধান নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো প্রমত্তা পদ্মা নদী, যা উত্তর সীমান্তকে আগলে রেখেছে। আর কুষ্টিয়া শহরের কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে পদ্মার প্রধান শাখা নদী ‘গড়াই’। এই গড়াই নদীকে কুষ্টিয়ার প্রাণ বলা চলে। এছাড়া জেলার বুক চিরে জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে মাথাভাঙ্গা নদী, কালীগঙ্গা নদী এবং কুমার নদ। এই নদীগুলোর বয়ে আনা পলিমাটির কারণেই কুষ্টিয়ার জমি অত্যন্ত উর্বর, যা যুগ যুগ ধরে এই অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে সচল রেখেছে।
কুষ্টিয়ার জলবায়ু মূলত ক্রান্তীয় মৌসুমী আবহাওয়ার অন্তর্গত। এখানে গ্রীষ্মকালে যেমন বেশ গরম পড়ে, তেমনই শীতের তীব্রতাও চমৎকার অনুভূত হয়। এই অঞ্চলের বার্ষিক গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা সাধারণত ৩৭.৮° সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে এবং শীতকালে গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১১.২° সেলসিয়াসে নেমে আসে। এখানকার ঋতুবৈচিত্র্যে বৃষ্টির ভূমিকাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ; কুষ্টিয়ায় বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ১,৪৬৭ মিলিমিটার, যা প্রধানত বর্ষাকালে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে হয়ে থাকে। এই পরিমিত বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার কারণে এখানে ধান, পাট, তামাক এবং শীতকালীন শাকসবজির বিপুল ফলন হয়।
ঐতিহাসিকভাবে কুষ্টিয়া কোনো প্রাচীন সামরিক বা রাজকীয় নগর ছিল না। বহু পূর্বে এই অঞ্চলটি অবিভক্ত ভারতের নদীয়া জেলার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশ কোম্পানি আমলে এটি যশোর জেলার অধীনে চলে যায় এবং একপর্যায়ে পাবনা জেলার মহকুমা ও থানা হিসেবে রাজশাহী বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৮২০ সালের বিখ্যাত ‘হ্যামিল্টন্স গেজেটিয়ার’-এ প্রথম এই কুষ্টিয়া শহরের নাম ও এর ভৌগোলিক গুরুত্বের কথা দাপ্তরিকভাবে উল্লেখ করা হয়। শহর হিসেবে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৮৬৯ সালে একটি ছিমছাম পৌরসভা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, যা আজ আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পৌরসভা এবং দেশের ১৩তম বৃহত্তম শহর হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে গড়াই নদীর তীরে একটি নদী বন্দর স্থাপনের মাধ্যমে এই অঞ্চলের আধুনিক পরিচিতি শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে নীলচাষী ও ইংরেজ নীলকরদের এই অঞ্চলে আগমন এবং তাদের প্রশাসনিক তৎপরতার ফলেই মূলত কুষ্টিয়ার মূল নগরায়ন ত্বরান্বিত হয়। ১৮৬০ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতার সাথে কুষ্টিয়ার সরাসরি রেললাইন স্থাপিত হলে এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটে। কলকাতার সাথে এই চমৎকার ভৌগোলিক ও রেল যোগাযোগের কারণে কুষ্টিয়া অঞ্চলটি ভারী শিল্প-কারখানার জন্য এক আদর্শ স্থান হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে। সেই সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগিয়েই মিলপাড়া এলাকায় গড়ে ওঠেছিল বিখ্যাত যজ্ঞেশ্বর ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস (১৮৯৬), রেণউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি (১৯০৪) এবং তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার অন্যতম বৃহৎ বস্ত্রকল মোহিনী মিলস (১৯০৮-১৯১৯)।
ভৌগোলিক সীমানার এই ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্য দিয়েই আজকের আধুনিক কুষ্টিয়া জেলা তার আত্মপরিচয় সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। গড়াই নদীর তীরের এই পলিমাটি যেমন জন্ম দিয়েছে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের আধ্যাত্মিক আখড়াবাড়ি, তেমনই কুমারখালীর শিলাইদহে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দিয়েছে তাঁর সাহিত্যজীবনের শ্রেষ্ঠ স্বর্ণযুগ কাটানোর প্রেরণা। সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা আগলে রাখা এই জেলাটি আজ কেবল ইতিহাসের পাতা ধুয়ে বেঁচে নেই; বরং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ একে দিয়েছে উচ্চশিক্ষার এক অনন্য আভিজাত্য। ভৌগোলিক চমৎকার অবস্থান, সুমিষ্ট প্রমিত ভাষা আর কর্মঠ মানুষের ছোঁয়ায় কুষ্টিয়া আজ সত্যি এদেশের মানচিত্রে এক অনন্য ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জেলা।
মন্তব্য