খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই জানুয়ারি ২০১৫, ১১:২৩ এএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গড়াই আর পদ্মা ধৌত পলিমাটিতে সিক্ত এক অনন্য জনপদ কুষ্টিয়া। এই মাটিকে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই এদেশের মানুষ মন থেকে মেনে নিয়ে ডাকেন ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’। পূর্বে অবিভক্ত ভারতের নদীয়া জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মহকুমা হিসেবে কুষ্টিয়ার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা সময়ের বিবর্তনে আজ ইতিহাস, ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এক অপূর্ব মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। বাউল সম্রাটের একতারা, বিশ্বকবির সাহিত্যিক অনুপ্রেরণা আর শত বছরের প্রাচীন স্থাপত্যের খোঁজে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের হাজারো মানুষ ছুটে আসেন এই পুণ্যভূমিতে। কুষ্টিয়ার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা এমনই কিছু প্রধান ও ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থানের আদ্যোপান্ত নিচে তুলে ধরা হলো।
কুষ্টিয়া ভ্রমণের কথা উঠলেই সবার আগে যে নামটি মনে পড়ে, তা হলো কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহে অবস্থিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত এই কুঠিবাড়ি। ছায়া সুনিবিড় ও নিভৃত এক মনোরম পরিবেশে তিন তলা পিরামিড আকৃতির এই ঐতিহাসিক ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে। পৈত্রিক জমিদারি তদারকি করার সূত্রে কবিগুরু তাঁর জীবনের এক দীর্ঘ ও সাহিত্যিক দিক থেকে অত্যন্ত মূল্যবান সময় এখানে কাটিয়েছিলেন। এখানেই বসে তিনি তাঁর ‘সোনার তরী’, ‘খেয়া’, ‘চোখের বালি’ এবং নোবেলজয়ী ‘গীতাঞ্জলি’র একটি বড় অংশ রচনা করেছিলেন। ভবনটিতে বর্তমানে কবির ব্যবহৃত বোট ‘পদ্মা’, তাঁর প্রিয় পালকি, লেখার টেবিল, পিয়ানো ও অসংখ্য দুর্লভ আলোকচিত্র নিয়ে একটি চমৎকার জাদুঘর গড়ে তোলা হয়েছে।
কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের ছেউড়িয়া গ্রামে অবস্থিত বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের পবিত্র সমাধি ও আখড়াবাড়ি। জাত-পাত আর ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের জয়গান গাওয়া এই আধ্যাত্মিক ভূমি আজও বিশ্বজুড়ে মানবতাবাদের এক পরম তীর্থস্থান। শ্বেতপাথরে বাঁধানো লালন সাঁইজির মূল মাজার এবং এর চারপাশের শান্ত পরিবেশ দর্শনার্থীদের মনে এক অদ্ভুত আত্মিক প্রশান্তি এনে দেয়। প্রতি বছর দোলপূর্ণিমায় এবং লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসে এখানে এক বিশাল সাধুসঙ্গ ও বাউল মেলার আয়োজন করা হয়, যেখানে একতারার টানে দেশ-বিদেশের লাখো মানুষ এসে সমবেত হন।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপনিবেশিক ঔপন্যাসিক ও কালজয়ী উপন্যাস ‘বিষাদসিন্ধু’র রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতিবিজড়িত বাস্তুভিটা কুমারখালী উপজেলার লাহিনীপাড়ায় অবস্থিত। সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় স্থান। এখানে মীর মশাররফ হোসেনের মূল বসতভিটার পাশাপাশি তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্মকে ধরে রাখার জন্য একটি সুন্দর স্মারক জাদুঘর ও গ্রন্থাগার গড়ে তোলা হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি কেবল শিলাইদহেই সীমাবদ্ধ নয়, কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়া এলাকাতেও রয়েছে তাঁর আরেকটি অনন্য ছোঁয়া। এই দোতলা ভবনটি ‘টেগর লজ’ নামে পরিচিত। জমিদারি ব্যবসার দেখাশোনা এবং কুষ্টিয়া শহরে কবিগুরুর যাতায়াতের সময় বিশ্রামের জন্য এই ভবনটি ব্যবহার করা হতো। এর স্থাপত্যশৈলী এবং শান্ত পরিবেশ দর্শনার্থীদের বেশ মুগ্ধ করে।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ঝাউদিয়া গ্রামে অবস্থিত চারশত বছরের পুরোনো এই ঐতিহাসিক শাহী জামে মসজিদ। লোকমুখে প্রচলিত তথ্য ও স্থাপত্যশৈলী অনুযায়ী, এটি মুঘল আমলে নবাব শায়েস্তা খানের রাজত্বকালে নির্মিত হয়েছিল। তিনটি বড় গম্বুজ বিশিষ্ট এই প্রাচীন মসজিদটি বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের এক নিখুঁত ও অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে আজও অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
কুষ্টিয়ার ধর্মীয় সম্প্রীতির অন্যতম এক অনন্য স্মারক হলো গোপীনাথ জিউর মন্দির। তৎকালীন নলডাঙ্গার মহারাজা প্রমথ ভূষণ দেব রায় কর্তৃক দানকৃত বিশাল জমির ওপর এই ঐতিহাসিক ও নান্দনিক মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এর কারুকার্য ও সনাতন ধর্মীয় আভিজাত্য দেখার জন্য বহু পুণ্যার্থী এখানে আসেন।
কুষ্টিয়া জেলাটি এদেশের বহু ‘প্রথম’ ঘটনার সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে:
জগতি রেলস্টেশন: কুষ্টিয়া শহরের অদূরে অবস্থিত এটি স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত দেশের সর্বপ্রথম রেলস্টেশন (১৮৬২ সালে স্থাপিত)।
কুমারখালী সরকারি বালিকা বিদ্যালয়: এটি দেশের অন্যতম প্রথম বালিকা বিদ্যালয় (স্থাপিত ১৮৬৩)।
মোহিনী মিলস: এক সময়ের অবিভক্ত ভারত তথা উপমহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম সুতি বস্ত্রকল, যা কুষ্টিয়ার শিল্পায়নের এক নীরব ঐতিহাসিক দলিল।
অন্যান্য নিদর্শন: এছাড়াও রয়েছে খোকসার ঐতিহ্যবাহী ফুলবাড়ি মঠ, বারাদি টেরাকোটা মঠ, স্বস্তিপুর শাহী জামে মসজিদ এবং দেশের প্রথম রেলসেতু হিসেবে পরিচিত গড়াই রেলসেতু।
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা এবং পাবনার ঈশ্বরদীর সংযোগস্থলে পদ্মা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে আছে ব্রিটিশ আমলের প্রকৌশলবিদ্যার এক বিস্ময়কর নিদর্শন ‘হার্ডিঞ্জ ব্রিজ’। এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় ও ঐতিহাসিক রেল সেতু। ঠিক এর পাশেই সড়ক যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন ‘লালন শাহ সেতু’, যা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সড়ক সেতু হিসেবে পরিচিত। বিকেলে এই দুই সেতুর পাদদেশে পদ্মার পাড়ে হাজারো মানুষ নদীর হাওয়া আর অপরূপ সূর্যাস্ত দেখতে ভিড় জমান।
কুষ্টিয়া শহরের একদম অদূরেই যেখানে প্রমত্তা পদ্মা নদী থেকে তার প্রধান শাখা নদী গড়াইয়ের উৎপত্তি হয়েছে, সেই মিলনস্থলটিই হলো বিখ্যাত পদ্মা-গড়াই মোহনা। এই স্থানটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এককথায় চোখ জুড়ানো। বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন দুই নদীর জলধারা কানায় কানায় পূর্ণ থাকে এবং শীতকালে যখন চরের বুকে বালুচর জেগে ওঠে, তখন এই মোহনাটি পর্যটকদের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য কুষ্টিয়ার ১৩ একর জমির ওপর নির্মিত হয়েছে খুলনা বিভাগের অন্যতম আধুনিক ও সুবৃহৎ স্টেডিয়াম ‘শেখ কামাল স্টেডিয়াম’। এর আন্তর্জাতিক মানের পরিকাঠামো কুষ্টিয়ার ক্রীড়াঙ্গনকে এক নতুন রূপ দিয়েছে। এছাড়া অবসরে গড়াই নদীর তীরে অবস্থিত ‘গড়াই পাড়’ এবং মনোরম ‘শেখ রাসেল সেতু’ ও ‘পরিমল থিয়েটার’ (যা প্রাচীন স্থায়ী রঙ্গমঞ্চের স্মৃতি বহন করে) এই শহরের নাগরিক জীবনে বিনোদনের চমৎকার রসদ জোগায়। পাশাপাশি দৌলতপুরের সুপরিচিত ‘গোল্ডেন ভিলেজ’ বা পঁচিশটি গ্রাম এবং জেলার বৃহত্তম ‘চাপাইগাছী-নান্দিয়ার বিল’ প্রকৃতির এক শান্ত রূপ নিয়ে পর্যটকদের স্বাগত জানায়।
মন্তব্য